দিনাজপুরে দেশের অন্যতম বৃহৎ ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত গোর-এ-শহীদ ঈদগাহে লাখো মুসল্লির সমাগম, তাকবিরে মুখরিত উত্তরবঙ্গ
ফিরোজ সরকার দিনাজপুর প্রতিনিধি :
ত্যাগ, কোরবানি ও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আহ্বান নিয়ে সারাদেশের মতো দিনাজপুরেও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল আজহা। এ উপলক্ষে দিনাজপুরের ঐতিহাসিক গোর-এ-শহীদ কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত হয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ঈদুল আজহার জামাত। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টায় লাখো ধর্মপ্রাণ মুসল্লির অংশগ্রহণে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
প্রায় ২২ একর বিস্তৃত এই ঐতিহাসিক ঈদগাহ মাঠ দীর্ঘদিন ধরেই উত্তরবঙ্গের বৃহৎ ঈদ জামাতের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। দিনাজপুর ছাড়াও ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে মুসল্লিরা এই জামাতে অংশ নিতে ভোর থেকেই দলে দলে মাঠে জড়ো হন।
সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো ঈদগাহ মাঠ পরিণত হয় জনসমুদ্রে। চারদিকে শুধু সাদা টুপি, পাঞ্জাবি ও তাকবিরের ধ্বনি— “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার…”
ধর্মীয় আবেগ, ভ্রাতৃত্ববোধ ও শান্তির বার্তায় মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো গোর-এ-শহীদ এলাকা।
বিশিষ্ট আলেমের ইমামতিতে অনুষ্ঠিত হয় প্রধান জামাত
ঈদের প্রধান জামাতে ইমামতি করেন দিনাজপুর জেলা ইমাম সমিতির সভাপতি ও বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন আলহাজ্ব মাওলানা মতিউর রহমান কাসেমী।
খুতবায় তিনি মুসলিম উম্মাহকে ইসলামের আদর্শ অনুসরণ, ত্যাগের শিক্ষা ধারণ এবং সমাজে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।
নামাজ শেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। একইসঙ্গে ফিলিস্তিন, কাশ্মীরসহ বিশ্বের নির্যাতিত মুসলমানদের জন্য দোয়া করা হয়।
কঠোর নিরাপত্তা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা
ঈদের বৃহৎ জামাতকে কেন্দ্র করে দিনাজপুর জেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয় নজিরবিহীন প্রস্তুতি। মুসল্লিদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে নামাজ আদায়ের জন্য—
অর্ধশতাধিক মাইক স্থাপন
১০টি প্রবেশ ও বাহির হওয়ার গেট
২টি ওয়াচ টাওয়ার মেডিকেল টিম ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা
বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা
অস্থায়ী ওযুখানা ও টয়লেট
নারী মুসল্লিদের জন্য পৃথক নামাজের স্থান
যানবাহন পার্কিংয়ের বিশেষ ব্যবস্থা
স্বেচ্ছাসেবক টিমের সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন
দিনাজপুর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয় তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মাঠজুড়ে পুলিশ, র্যাব, আনসার ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সতর্ক অবস্থান লক্ষ্য করা যায়।
এছাড়া সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ চালানো হয় পুরো ঈদগাহ ও আশপাশের এলাকায়।
ঈদের জামাতে অংশ নেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ
ঈদের এই বৃহৎ জামাতে অংশ নেন দিনাজপুর সদর আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম, পুলিশ সুপার জেদান আল মুসা, দিনাজপুর পৌরসভার প্রশাসক মোঃ রিয়াজ উদ্দিনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।শিশু, কিশোর, যুবক ও প্রবীণসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে পুরো ঈদগাহ মাঠ হয়ে ওঠে এক মিলনমেলা। ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম নির্বিশেষে মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ আদায় করেন।
আহলে হাদিস অনুসারীদের পৃথক জামাত
এদিকে আহলে হাদিস অনুসারীদের প্রধান ঈদ জামাত সকাল সাড়ে ৭টায় দিনাজপুর আদর্শ কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিপুল সংখ্যক মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জামাত সম্পন্ন হয়
শহরজুড়ে শতাধিক ঈদ জামাত
দিনাজপুর শহরের চাউলিয়াপট্টি-দক্ষিণ লালবাগ ঈদগাহ মাঠ, পশ্চিম পাটুয়াপাড়া জামে মসজিদ সংলগ্ন ঈদগাহ মাঠ, বালুয়াডাঙ্গা ঈদগাহ মাঠ, লালবাগ ফুটবল মাঠ, ইকবাল স্কুল মাঠ, তফিউদ্দিন মেমোরিয়াল স্কুল ঈদগাহ মাঠ, সুইহারি ঈদগাহ মাঠসহ অর্ধশতাধিক ঈদগাহ ও মসজিদে ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
অপরদিকে জেলা শহরের বাইরে সদর উপজেলার চেরাডাঙ্গী ঈদগাহ মাঠেও বৃহৎ ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানা গেছশান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে দিনাজপুরে পবিত্র ঈদুল আজহার জামাত সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন মুসল্লি, স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
দিনাজপুর জেলা প্রশাসন, দিনাজপুর পৌরসভা, জেলা পুলিশ, স্থানীয় মুসল্লি ও সংশ্লিষ্ট সূত্র।
স্থান : গোর-এ-শহীদ কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দান, দিনাজপুর।