রূপগঞ্জে রংধনু গ্ৰুফের মালিক‘আন্ডা রফিক’ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য জমি দখল, ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি ও নারী নির্যাতন আতঙ্কে ভুক্তভোগীরা
মোঃ আসিফুজ্জামান আসিফ : রাজধানীর অদূরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় জমি দখল, আর্থিক জালিয়াতি, ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারি ও প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার অভিযোগে আলোচনায় রয়েছেন রংধনু গ্রুপের মালিক ভূমি খেকো, নারী পিপাসু মোঃ রফিকুল ইসলাম, যিনি স্থানীয়ভাবে “আন্ডা রফিক” নামে পরিচিত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে এলাকায় ভয়ভীতি সৃষ্টি, জমি দখল এবং অর্থ আদায়ের মতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন তিনি ও তার সহযোগীরা। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উত্থানের পেছনের গল্প
স্থানীয় সূত্র ’, এক সময় সীমিত আয়ের জীবনযাপন করলেও অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন রফিকুল ইসলাম। ছোট ব্যবসা থেকে শুরু করে তিনি গড়ে তোলেন “রংধনু গ্রুপ” নামে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।
তবে স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, এই উত্থানের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার ব্যবহার ছিল।
শত শত কোটি টাকার ব্যাংক ঋণের অভিযোগ তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের বারিধারা শাখা থেকে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের বসুন্ধরা শাখা থেকে প্রায় ২৭০ কোটি টাকা এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এসব অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
মানিলন্ডারিং মামলা ও তদন্ত প্রতারণা ও অর্থপাচারের অভিযোগে রফিকুল ইসলাম ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং মামলা দায়ের করা হয়েছে।
২০২৫ সালের ৭ আগস্ট গুলশান থানায় দায়ের করা মামলাটি বর্তমানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট তদন্ত করছে।
মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, রংধনু বিল্ডার্সের নামে জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করা হয়।
সম্পদ জব্দ তদন্তে রাজধানীর বনানীতে একটি ৯ তলা ভবনের তথ্য উঠে আসে, যেখানে একটি হোটেল পরিচালিত হচ্ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভবনটি কো-অপারেটিভ ব্যাংক অব বাংলাদেশের কাছে জামানত হিসেবে রাখা ছিল।
পরে আদালতের নির্দেশে সিআইডি ওই সম্পদ ক্রোক করে এবং সংশ্লিষ্ট অর্থ ফ্রিজ করে।
রাষ্ট্রীয় সংস্থার নজরদারি রফিকুল ইসলামের আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের উৎস নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা অনুসন্ধান চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে এখনো পর্যন্ত এসব সংস্থার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
জমি দখল ও আতঙ্ক স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় জমি দখলের ঘটনা ঘটেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একাধিক পরিবার ভয়ে এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
একজন বৃদ্ধা নারীর অভিযোগ, তার প্রায় ৩ বিঘা জমি দখলের চেষ্টা করা হয়। চাপের মুখে তিনি নিজের চারতলা বাড়ি তালাবদ্ধ করে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন।
আরেক ভুক্তভোগীর দাবি, তার পরিবারের কাছে অর্থ দাবি করা হয়েছিল। তা না দিলে তাদের এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয় এবং পরবর্তীতে বাড়ির একাধিক ইউনিট ভাঙচুর করা হয়।
প্রভাব ও ক্ষমতার অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রে আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে বিশেষ করে সাবেক পাট বস্ত্র মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী ও পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দেশত্যাগ ও নতুন গুঞ্জন
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তিনি দেশত্যাগ করেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ফিরে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন—এমন গুঞ্জনও রয়েছে।
প্রশ্ন রয়ে গেছে এত অভিযোগের পরও কীভাবে তিনি প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন—এ প্রশ্ন এখন এলাকাবাসীর মুখে মুখে।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন— কবে তারা ন্যায়বিচার পাবেন? আইনের সমতা কি বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হবে? তারা কি ফিরে পাবেন তাদের ন্যায্য অধিকার?
রফিকুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ এখন তদন্তাধীন। তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।